ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা ফুটবলের দুই চির শক্র। ব্রাজিল যখন অন্য দলের সাথে খেলে, তখন আর্জেন্টিনার সমর্থকরা চায় ব্রাজিল হেরে যাক। একইভাবে আবার আর্জেন্টিনার সঙ্গে অন্য দলের খেলা থাকলে ব্রাজিলের সমর্থকরা মনেপ্রাণে আর্জেন্টিনার পরাজয় কামনা করে। তাই চাই কি না আমরা?

সততার সাথে প্রশ্নটির উত্তর দেবেন। নিশ্চিত করেই বলা যায়, অন্তত ৯৫ ভাগ সমর্থকই তাই চায়। বাংলাদেশ সারাজীবনে ফুটবল বিশ্বকাপ খেলতে পারবে না বলেই মনে হয়। তারপরও অন্য যেকোনো একটি দলের সাথে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল হেরে গেলে এই দুই দলের সমর্থকরাই খুশি হয়। এটা খুবই সাধারণ একটি বিষয়। স্বাভাবিকও বটে।

ভুলেও কিন্তু বলবেন না ব্রাজিল যখন জার্মানির কাছে সাত গোল খায়, তখন আর্জেন্টিনার সমর্থকরা খুশি হয় নি। কেন খুশি হবে না? আর জার্মানির কাছে ফাইনালে হারের পর খুশি হয়েছে ব্রাজিল সমর্থকও। কেন তারা খুশি হবে না, বলুন তো দেখি?

বাংলাদেশ ক্রিকেটে ভালো করার আগে এই দেশের বেশিরভাগ মানুষ হয় ভারত নয় পাকিস্তানকে সমর্থন করেছে। গুটিকয়েক সমর্থন করেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর পরে সাউথ আফ্রিকা। আমার বন্ধুবান্ধবদের কথাই বলছি। ‍উল্লেখ্য, আমার বন্ধুরা বেশিরভাগই খেলাধুলায় নিয়মিত ছিলো, শুধু খেলা দেখতো না।

দুঃখের বিষয় হলো বাংলাদেশ ক্রিকেটে ভালো করার পরও মাঠে দেখা গেছে ভারত আর পাকিস্তান এই দুই দেশের পতাকার মিছিল। গ্যালারিতে ‘ম্যারি মি আফ্রিদি’। সাম্প্রতিক হয়ে যাওয়া এশিয়া কাপেও ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের টিকেট বিক্রি শেষ হয়েছে খুব দ্রুত। এটা কতটা লজ্জার ভাই ও বোনেরা? কেন সমালোচনা করছেন গতকাল ওয়েস্ট ইন্ডিজ বা তার আগের দিন অস্ট্রেলিয়া সাপোর্ট করেছি বলে? বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মানুষই তো করেছে? সবাই তাহলে একটা হুজুগে আছে, তাই না?

কেন এই পাশের দুইটা দেশকে আমাদের কোন না কোনভাবে সাপোর্ট দিয়ে যেতেই হবে? কেন? একটি দেশ গণহত্যা, ধর্ষণ করেছে দীর্ঘদিন যাবত আর একটি দেশ ৪৫ বছর ধরে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ভৌগলিক আর এখন আমাদের খেলা নিয়ে রাজনীতি করছে বলে? কি দায়টা আছে যে এই দুই দলকে সাপোর্ট করবো? কিসের অকৃত্রিম বন্ধুত্ব?

গতকালের খেলায় তো দেখা গেলো স্টেপিং-এ নো ছাড়াও ওয়েস্ট-হাই কয়েকটা নো হয়েছিলো। ড্যারেন স্যামি লাফিয়ে উঠেছিলেন। লাভ কী? ওই নো বলগুলো তো কাটিয়ে দিয়েছেন গোল্ড বাবাজি! চার্লস মাথার ওপর থেকে হুক করে চার মেরেছেন। চোখ কি আমি বা আমরা পকেটে লুকিয়ে রেখে খেলা দেখি না কি? রোহিতের কোমরের নীচের বলটিকে ২০১৫ বিশ্বকাপে নো ডেকে আমাদের স্বপ্নগুলোকে ‘নো’ বানিয়েছিলো এই আম্পায়ারগুলো। কবে আমরা বুঝবো যে আইসিসি আসলে একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান নয়? তিন মোড়ল থাকলেও এখন পাশের দেশের মোড়লটি ভালোই কলকাঠি নাড়ে। বেশ প্রভাব তাদের উচ্চ পর্যায়ে।

আর আমাদের খেলোয়াড়দের ওপর চূড়ান্ত প্রভাব পড়েছে এতে। মুশফিকুর রহিম স্ট্যাটাস দিয়ে বসেছেন। পরে অবশ্য তুলেও নিয়েছেন। কেন তুললেন আপনি আপনার স্ট্যাটাস? আপনাকে কার কাছে জবাবদিহিতা করতে হবে? না কি আইসিসি অন্য কোন ফাঁদে আপনাকে ফাঁসাবে, বলেছে ওরা? তুলেই যখন নেবেন, তখন স্ট্যাটাস দেওয়ার আগে ভাবা উচিত ছিলো। তাসকিন’ও স্ট্যাটাস দিয়েছে। ওরটা এখনো আছে কি না জানি না।

আপনাদের কী মনে হয়? ভারতে আমাদের দল খুব শান্তিতে দিনযাপন করে এসেছে? শুনুন, সারাটা সময় আমাদের দলটির ওপর ভীষণ মানসিক চাপ দেওয়া হয়েছে। এগুলো কখনোই প্লেয়াররা বলবে না। মিডিয়া, প্রশাসন- সমস্ত জায়গা থেকে। তাসকিন আর সানির না থাকায় পাল্টে গেছে পুরো দলের দেহভাষা। পেশাদারিত্ব হতো, যদি আমরা সত্যিই তিন বলে দুই রান করতে পারতাম। পারি নাই, তো কী হয়েছে? পারবো নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে। তাও ভারত আর পাকিস্তানের সমর্থনই কি করতে  হবে ভাই ও বোনেরা? স্লো ওভার রেটে জরিমানা গুনলো মাশরাফি। আর ধোনিজি প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে শেষ তিন ওভার করলেন। ক্ষতি কি? আইসিসি উসকো পাস হ্যায় না!

খেলাধুলা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে করিনি। কিন্তু একেবারে কমও কিন্তু করিনি। মাঠের মেজাজ বুঝি আমি, মাঠে খেলে। মাঠের বাইরের রাজনীতিও বুঝি প্রচুর খেলেছি বলে। মাঠের বাইরে থেকে বসে যে লিখছি তা কিন্তু না।

কেন ভাই গতকাল ওয়েস্ট ইন্ডিজ সাপোর্ট করেছি বলে কি খুব পাপ হয়ে গেছে? আমাদের যে দলটি হারিয়েছে তাদের এগেইনস্ট এ সাপোর্ট করতেই পারি। সমস্যা কী? পাকিস্তান খেললেও তার এগেইনস্ট-এ সাপোর্ট থাকতো আমার।

অস্ট্রেলিয়া যখন তাদের মোড়লগিরির চূড়ান্তে ছিলো তখন যদু-মধু সবাইকে সাপোর্ট করেছি। যেই খেলতো অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তাকেই সাপোর্ট দিতাম। ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, জিম্বাবুয়ে- যেই খেলুক। এখন ইন্ডিয়া ওই অস্ট্রেলিয়ার আগের জায়গাতে গেছে। তাই পুরো বাংলাদেশর মানুষ একই অবস্থানে। ওদের মোড়লগিরিটা অবশ্য অস্ট্রেলিয়ার থেকেও বেশি।

পরিশেষে খেলোয়াড়ি কথা বলি: আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ক্রিকেটার একজন ভারতীয়। বর্তমানে আমার সবচেয়ে প্রিয় অধিনায়ক, একজন ভারতীয়। এই মূহুর্তে আমার সবচেয়ে প্রিয় ব্যাটসম্যানটিও কিন্তু ভারতীয়।

গতকাল থেকে অনেক বন্ধুদের স্ট্যাটাস পড়ে আসলাম ফেসবুক ঘুরে। ৯৫ ভাগ খুশি। অনেক খুশি। আমার খুব কাছের এক বন্ধু যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পর ইন্ডিয়াকে তুমুল সাপোর্ট করতো, সে বলেছে ‘ইন্ডিয়া হারলে এতো ভাল লাগে ক্যান?’ এরকম শত-সহস্র স্ট্যাটাস। আপনি আমি তাহলে কোন কাননের ফুল যে ওয়েস্ট ইন্ডিজ জেতার পর খুশি হয়ে একদলা আনন্দের কথা লিখতে পারবো না ফেসবুকে? ফেসবুক তো আমার আপনার ব্যক্তিগত সম্পত্তি। অন্য কারও নয়।

সুতরাং ঝেড়ে কাশুন জনাব, হ্যাঁ, আপনারা যারা সমালোচনা করছেন আমাদের, যারা খুশি হয়েছি ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয়ে। গত রাতে ভারত বধের পর কেউ কেউ ফেসবুকের ইনবক্সে বিদ্রুপাত্মক মেসেজ পাঠিয়েছেন বলেই এই লেখার উদয়।

অবশ্যই খুশি হয়েছি ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতেছে বলে। একশ’ বার হয়েছি। হাজার বার হয়েছি। কোন সমস্যা? মুশফিক, আপনি আপনার ব্যক্তিগত মত মুছে ফেললেও, আমি কিন্তু তা আমার ফেসবুকে এবং এ লেখায় রেখে দিলাম।

নিশ্চয়ই কোটিগুণ বেশি খুশি হতাম যদি ওদের মাটিতে ওদের বধ করতে পারতাম। পারিনি তবে পারবো না, তা কিন্ত না। বাংলাদেশ গত এক বছর যাবত দারুণ ক্রিকেট খেলছে। আরো অনেক ভালো করবে সামনের দিনগুলোতে। সে দিন বেশি দূরে নয়।

Advertisements