ইংল্যান্ডের সঙ্গে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের আনন্দে ভাসছে পুরো দেশ। স্বভাবতই এমন আনন্দে শামিল হওয়াটাই কাম্য এবং হচ্ছেও তাই। তবে এর ভেতর দেখা যাচ্ছে কেউ কেউ বলছেন, মাঠে করা ভুলগুলো নিয়েও কথা হওয়া উচিত- ইংল্যান্ডের সঙ্গে ওয়ানডে সিরিজ থেকে শুরু করে টেস্ট সিরিজ অব্দি। এসব আলোচনা-সমালোচনা-তর্ক আর কুতর্ক বেশিরভাগই চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তবে বিশেষ করে ক্রিকেট খেলার ক্ষেত্রে মানুষের ভালোবাসা, উদ্দীপনা আর সমালোচনার যেনো অন্ত নেই এই ডিজিটাল মাধ্যমে। আমরা যারা জনসাধারণ, তারা প্রায় সবাই ক্রিকেট নিয়ে বহুমাত্রিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করছি। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে খুব সহজেই বেরিয়ে আসে কতোদিন ধরে আমরা ক্রিকেট খেলছি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। আর যে দলটি ক্রিকেট খেলার জন্ম দিলো তারা কতোদিন ধরে খেলছে সে আলোচনায় যাওয়াটা বোকামি হবে। একটু পেছনে ফিরে যদি তাকাই, যে কেনিয়াকে হারিয়ে আমরা ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলার মর্যাদা পেয়েছি, সেই কেনিয়া এখন যেখানে, তার থেকে আমাদের দূরত্ব কতোটা, সেটাও কিন্তু ভাবতে হবে। একটি খেলার সামগ্রিক উন্নয়নের পেছনে অবশ্যই বোর্ডের ভূমিকা থাকে। সেজন্য কেনিয়া বা জিম্বাবুয়ের চেয়ে আজ এত দূর উন্নতি করতে পেরেছি আমরা। গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় রয়েছে তা হলো একজন সাকিব, মুশফিক, রিয়াদ, মাশরাফি, নাসির, সৌম্য, মোস্তাফিজ কিংবা বর্তমান সময়ের সেনসেশন মিরাজ বা মোসাদ্দেক কিংবা সাব্বির- এদের উঠে আসার গল্পটা অনেকটাই নায়কোচিত। এখানে বোর্ডের একজন খেলোয়াড় তৈরি করার সুযোগ কম ছিল। নিজস্ব প্রতিভায়, বলা চলে বিস্ময়কর প্রতিভায় এরা যোগ্যতা প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছেন। কেউ কেউ প্রান্তিক জনপদ থেকে উঠে এসেছেন অসীম ক্রিকেটীয় মেধার কারণে। অন্য একটি বড় ক্রিকেট দল স্কুল থেকে বাছাই করে ধীরে ধীরে তাদের যোগ্য খেলোয়াড়টিকে জাতীয় দল পর্যন্ত নিয়ে আসে, আর এর পেছনে যে বিশাল সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা কাজ করে, সেখানে হয়তো আমরা এখনো পিছিয়ে। সেই মহাসড়কে ওঠার কাজটি করে দিতে হবে বিসিবি’কে। কে টেস্ট, কে ওয়ানডে আর কে খেলবে টি টোয়েন্টি- সেটিও খুব দ্রুতই ঠিক করে ফেলতে হবে। উদাহরণ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ভারত, নিউজিল্যন্ডের কথা আলোচনায় এমনিই চলে আসে। ছক-বাঁধা পরিকল্পনায় এগিয়ে যাচ্ছে ওরা। তৃণমূল থেকে খেলোয়াড় বাছাই এবং সব ফরম্যাটে যোগ্যতার বিচারে খেলোয়াড় নির্বাচনের চর্চা হয়তো আমাদের এখানে এখনো গড়ে ওঠেনি। ফরম্যাট নিয়ে যেহেতু কথা হলো, তাই বলাই যায়, বাংলাদেশ ওয়ানডে দল বিশ্বের অন্যতম সেরা দলের একটি। টি টোয়েন্টি আর টেস্টে পরিপক্কতার জন্য প্রয়োজন আর একটু মনোযোগ, ধৈর্য এবং সাধনা। ওয়ানডে ফরম্যাটে দারুণ একটা দল হিসেবে প্রমাণ করার জন্য একজন মাশরাফির মতো দলনেতার খুব দরকার ছিল। সে কারণে ভারত, পাকিস্তান, সাউথ আফ্রিকার মতো বড় দলগুলোর সঙ্গে প্রায় অনায়াসে আমরা ওডিআই সিরিজগুলো জিততে পেরেছি ঘরের মাঠে। পরিকল্পনার জায়গায় যে বিষয়টি ভাবতে হবে, তা হলো পরবর্তী মাশরাফি কে হতে পারেন? আবারও বলতেই হচ্ছে, সত্যিই বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে যে কোন ফরম্যাটের খেলার জন্য কোন খেলোয়াড় সত্যিই উপযোগী। হয়তো টেস্ট এর বিচারে বোর্ডকে ভাবতে হতে পারে মুশফিক কি টেস্ট কিপিং-এ ফিট কি না? তাকে ভার কমিয়ে দিয়ে টেস্টে আরও বেশি ব্যাটিং এবং অধিনায়কের কাজটা আরও ঠাণ্ডা মাথায় করতে দেওয়া যায় কি না। আর কে কতো নম্বরে ব্যাট করবেন সেটাও ঠিক করা জরুরি। ফিল্ডিং-এ প্রেশারটা কখন বাড়াতে হবে, সেটাও পেশাদারিত্বের অংশ। তিনদিনে টেস্ট শেষে জয়ের বন্দরে পৌঁছেছি ঠিকই, কিন্তু এখানেই সবটুকু শেষ নয়। তাকাতে হবে ভবিষ্যতে। খেলোয়াড়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগ কয়টি টেস্ট বা ওয়ানডে সিরিজ খেলতে পারছি আমরা বছরে? নির্মম হলেও কথাটা সত্যি যে আমাদের ক্রিকেট খেলোয়াড়েরা বছরের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হন। হুট করেই তাই হোম বা অ্যাওয়ে ম্যাচে তাদের কাছে অভাবনীয় পারফরম্যান্স আশা করাটা নেহায়েত অন্যায় ছাড়া আর কিছু হবে না। যেহেতু টেস্টে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রথম জয় নিয়ে এই লেখার সূত্রপাত, তাই বলতেই হয় স্কুল পর্যায় থেকেই লংগার ভার্সনের ক্রিকেট খেলাতে হবে। পিচে টিকে থাকার অভ্যাসটা ছোটবেলা থেকে মনে আর মগজে ঢোকানোর কাজটা হওয়া অতীব জরুরি। এরকম হওয়া মানেই বাংলাদেশের ক্রিকেটের একটি পর্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন যা শুধু আপাতদৃষ্টিতে জয় পাওয়া দিয়ে বিবেচ্য নয়, বরং ক্রিকেট উন্নয়নের একটি শক্ত ভিত তৈরি করে দিতে পারবে। তাহলে সব ধরণের ফরম্যাটে অবশ্যই আমরা ধারাবাহিক সাফল্যের মুখ দেখতে পারবো।

চ্যানেল আই অনলাইন/সম্পাদকীয়/৩১ অক্টোবর, ২০১৬

Advertisements