নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ওয়ানডে এবং টিটুয়েন্টি সিরিজে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর ছিল না। এরপর টাইগার সমর্থকরা ধরেই নিয়েছিল যে বাংলাদেশের টেস্ট অভিজ্ঞতাটা হবে ভয়ংকর। সেই ধরে নেওয়াটা দোষের নয়। কিন্তু বাউন্সি পিচে আর উইন্ডি আবহাওয়ার বেসিন রিজার্ভে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে যা করেছে, তা বিস্ময়কর, গৌরবের এবং রেকর্ডের বন্যায় ভাসানো।

তবে চার দিন শেষে বড় ক্ষত দুটো: ১. অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমের আঙুলে চোট আর ২. ইমরুল কায়েসের মাসল পুলে দু’জন নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যানকে শেষ দিনে পাচ্ছে না বাংলাদেশ। মুশফিক অবশ্য চাইছেন শেষ দিনে তার ব্যাট দিয়ে বাংলাদেশকে আশার গল্প শোনাতে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য তা কতোটা ভাল হবে তাও ভেবে দেখা দরকার। অধিনায়কের আরও বড় কোন ইনজুরি ভবিষ্যতে টাইগার টিমকে আরও কঠিন বিপদে ফেলতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।

আজ ইমরুলের মাঠ থেকে স্ট্রেচারে করে বের হওয়ার সময় কিছুটা খটকা লেগেছিলো। এর পেছনে লাফিয়ে পড়াকেই সবাই দোষ দিয়েছেন। তবে ১৪৮.২ ওভার কিপিং এর কারণে মাসলে আগেই একটা বড় ধাক্কা পড়েছিলো এতে সন্দেহ নেই। লাফ দিয়ে রান আউট থেকে বাঁচার চেষ্টা এবং অলরেডি প্রেশারড মাসলে পুল হয়ে যাওয়াটা তাই অস্বাভাবিক কিছু না। টাইগার ভক্তদের চাওয়া: দ্রুতই সুস্থ হয়ে উঠুন ইমরুল। একই চাওয়া ক্যাপ্টেনের জন্য।

ক্রিকেটে প্রায়ই কয়েনের এ পিঠ পাল্টে অন্য পিঠে পড়ে। টেস্ট ক্রিকেটে চতুর্থ দিনটি ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয়। মুশি’র কয়েন রহস্য নয় এটি, কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে চতুর্থ দিনটি কয়েনের রহস্যে ভরা থাকে। ইমরুল বের হয়ে যাওয়ার বাস্তবতায় পর পর টপাটপ কয়েকটি উইকেট পড়লো। তামিম, মাহমুদুল্লাহ গেলেন, আর মিরাজের অনাকাঙ্খিত রান-আউট। একটা তাড়াহুড়া কাজ করছিল সবার ভেতর। মনে রাখা উচিত, টাইগারদের দেশের বাইরে টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে। সেখানে নিউজিল্যান্ডের মতো একটি দেশে, সেরকম কন্ডিশনে তারা যে ফাইট করে যাচ্ছে– সেই বা কম কী?

ইনফর্ম তামিম আর ইমরুল যা খেলছিলেন তাতে বলাই যাচ্ছিল পঞ্চম দিনে একটা স্পোর্টিং টোট্যালে নিউজিল্যান্ডকে ব্যাট করতে আহ্বান করবে বাংলাদেশ। মানে ডিক্লেয়ার করবে পঞ্চম দিনে। তবে এখন পরিস্থিতিটা ভিন্ন। বেশ ঘোলাটে এবং কিছুটা জটিলও। আগামীকাল মুমিনুল, সাকিব আর সাব্বিরের অনেক কাজ পড়ে রয়েছে। সেই কাজ কঠিন করে তুলতে মরিয়া হয়ে থাকবে কিউই বোলাররা।

যথারীতি আশা থাকবে সাকিব ভালো খেলবেন এই ব্যাটিং উইকেটে। মুমিনুল আর সাব্বিরের ক্ষেত্রেও তেমনই আশা আমাদের। মুমিনুল ক্রিজ ধরে রাখবেন। কিন্তু তা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে নিউজিল্যান্ড যে ছোবল দেবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। মাথার ওপর একটা চাপ তো রয়েছেই যে দু’জন ভালো ব্যাটার পাচ্ছে না বাংলাদেশ। যদিও মুশফিকের বিষয়টি এখনই বলা যাচ্ছে না।

সাকিব তার স্বভাবসুলভ ব্যাটিং করবেনই। পয়েন্ট এবং ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট রিজিওনে কাট করবেন। শর্ট বল স্পেশালিস্ট ওয়াগনার সেক্ষেত্রে সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারেন। তবে সাকিব দাঁড়িয়ে গেলে ভিন্ন কথা। অন্যদিকে স্যান্টনার সাব-কন্টিনেন্ট পিচে ভালো পারফর্ম করেছেন বলেই, তিনি জানেন হার্ড পিচে কোন জায়গায়, কোন ফ্লাইটে বল ছুঁড়তে হবে সাব কন্টিনেন্টের ব্যাটসম্যানদের। এত কিছু বিচার করে, ফাইনাল ডে তে ডিক্লারেশন এর বিষয়টি আপাতত মাথায় মনে হয় রাখছে না টিম টাইগার্স।

লক্ষ্য হতে হবে অন্তত দেড়টা সেশন পার করা, দুটো না পারলেও। উইলিয়ামসন অনেক ক্লোজ ফিল্ড ঠিক করে দেবেন। স্কয়ার লেগকে টেনে শর্ট মিড উইকেটে রেখে বাউন্সার দিতে বলবেন তার বোলারদের- সন্দেহ নেই। শর্ট ফাইন, কাভার- যতো অ্যাটাকিং ফিল্ড আছে তা তিনি ব্যবহার করবেন। বাংলাদেশ দলকে মনে রাখতে হবে, টেস্ট ক্রিকেট শক্ত মানসিকতা এবং ধৈর্যের খেলা। বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে সফলতার সঙ্গে যেহেতু দেখিয়েছে তাই দ্বিতীয় ইনিংসেও সেটা করার চেষ্টা থাকবে বলেই ভক্তরা আশা করেন।

দ্বিতীয় ইনিংসে এখন পরীক্ষাটা হয়তো একটু কঠিনই হয়ে গেলো। তারপরও দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো কিছু হয়নি। অন্তত একটি ড্র এই টেস্ট থেকে আশা করাই যায়। আপাতদৃষ্টিতে ড্র’ই দেখতে পাচ্ছেন অনেকে। শুধু প্রয়োজন, ইমরুল এবং মুশফিকের জায়গাটার অভাব কাউকে টের পেতে না দেওয়া।

ব্যাকফুটে যত খেলাতে পারবে নিউজিল্যান্ড ততই তারা আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবে। তাই ডাউন দ্য উইকেট না হলেও, খেলতে হবে ফ্রন্ট ফুটে অথবা বল ছাড়তে হবে যথেষ্ট আস্থা নিয়ে। কারণ ওয়েলিংটনের বাতাস এমনিতেই রিভার্স সুইং সহায়ক। সেখানে বোলারদের বিদ্যা খুব একটা প্রয়োজন হবে বলে মনে হয় না। বল কয়েক ইঞ্চি এমনিই ঘুরে ধেয়ে আসতে পারে উইকেটের দিকে।

বাংলাদেশের জন্য ২০১৫ সাল ছিল ওয়ানডেতে উত্থানের বছর। আর এ বছরটি মনে হচ্ছে টেস্ট ক্রিকেটের জন্য। তবে জাতীয় ক্রিকেট দলটি সব ফরম্যাটে ভালো করুক সেই আশা দেশের প্রতিটি ক্রিকেটপ্রেমীর।

বাংলাদেশকে কালকের দিনটির জন্য খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। জয় পাওয়ার সুযোগ হয়তো নেই। তবে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, উইকেট ধরে খেললে দুটো সেশন অবলীলায় পার করে দিতে পারবে টাইগাররা। আর এই আস্থাও রাখতে হবে মনে যে নিউজিল্যান্ডের মতো দলেরও কিন্তু বড় কলাপস হতে পারে। ওরাও রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ। পৃথিবীর বাইরে থেকে আসা কোন এলিয়েন নয়।

আপাতত, বাংলাদেশের কাজ একটাই- ইমরুল আর মুশফিক যে নেই, তা ভুলে যেতে হবে, একদম ভুলে গিয়ে পঞ্চম দিনের সকালটা শুরু করতে হবে, কারণ সাদা-পোশাকের ম্যাচে ষোল কোটি মানুষের এবারের আশাটা টিকে থাকার। জেতার না হলেও হারারও নয়।

Advertisements